কবরের আযাব ও প্রশ্নোত্তর সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং তার দলীলভিত্তিক জবাব।

বরাবর,

ফাতাওয়া বিভাগ,মারকাযুল উলূমিদ দ্বীনিয়্যাহ

ভেলানগর,নরসিংদী সদর,বাংলাদেশ।

বিষয়: কবরের আযাব ও প্রশ্নোত্তর সম্পর্কে।

মুহতারাম,আমার জানার বিষয় হলো,

(ক) আমরা জানি কবরে মৃত ব্যক্তির প্রশ্নোত্তর হয়। কিন্তু যারা আগুনে পুড়ে মরে, পানিতে ডুবে মরে কিংবা বাঘে খেয়ে নেয়, তাদের প্রশ্নোত্তর কোথায় হবে?

(খ) কবরে মানুষকে কবরের মাটি দু’পাশ থেকে চাপ দেয়, কথা কি সঠিক?

(গ) সাধারণত আমরা দেখি আগে হিসাব হয়, তারপর শাস্তি হয়। কিন্তু কবরে তো মানুষের হিসাবের ‍পূর্বেই শাস্তি দেয়া হচ্ছে !!!

অতএব,মুহতারামের কাছে আমার আবেদন এই যে, তিনি যেন কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহে ইসলামীর আলোকে উক্ত প্রশ্নগুলোর সমাধান জানিয়ে বাধিত করেন।

নিবেদক

মুহাম্মাদ রমাদ্বন সাহেব

নরসিংদী সদর, নরসিংদী

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله رب العلمين و الصلاة و السلام على سيد الانبياء و المرسلين اما بعد:

উত্তর:

(ক) মৃত ব্যক্তির প্রশ্নোত্তর শুধু কবরেই হবে, এ ধারনাটি ঠিক নয়। বরং মানুষের মৃত্যুর পর রুহ যেখানে থাকবে সেখানেই প্রশ্নোত্তর হবে। সেটি মাটির কবরে হোক কিংবা অনত্রে।

কবরের জগতকে “আলমে বরযখ” বলে, যা মানুষের মৃত্যুর পর থেকে পুনরুত্থান পযর্ন্ত সময়কে বুঝায়। কোরআন-হাদীসে কবর জীবন সম্পর্কে আমাদেরকে যা অবহিত করা হয়েছে, তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে নেয়াই হবে ঈমান বিল গায়েবের দাবী।

সুনিশ্চিত কথা হলো, প্রতিটি মানুষকেই প্রশ্নোত্তরের সম্মুখীন হতে হবে। এবং কিছু কিছু হাদীসে প্রশ্নোত্তরের বিশেষ কিছু পদ্বতী ও বর্ণিত হয়েছে।

(সুনানে আবু দাউদ : হাদীস নম্বর : ৪৭৫৩, মাজমাউয ‍যাওয়ায়েদ : ৩/৫০-৫৩)

তবে আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণ করলে, পানিতে ডুবে মারা গেলে কিভাবে প্রশ্নোত্তর করা হবে, তা আল্লাহ তা’লাই ভালো জানেন।

এ সংশয় হওয়া উচিত নয় যে, মানুষের শরীর না থাকলে তার প্রশ্নোত্তর হওয়াটা দুস্কর, কারণ এই প্রশ্নোত্তরগুলো ”আলমে বরযখে” ব্যক্তির রুহের সাথে সংঘঠিত হয়। শরীর কেবল তার অনুগামী মাত্র। এমনকি আল্লাহ তা’লা চাইলে ব্যক্তির রুহের সাথে তার শরীরকে ও মুহুর্তের মধ্যে একাকার করে দিতে পারেন। যেমনটি সহীহ বুখারীর একটি হাদীস থেকে জানা যায়। (সহীহ বুখারী, হাদীস নম্বর: ৬৪৮০,৬৪৮১)

(খ) হ্যাঁ কথাটি সঠিক। সুনানে আবু দাউদের এক দীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, কাফেরের কবর তার জন্য এতই সংকুচিত হয়ে যাবে যে, তার পাজরের একপার্শ অপর পার্শে চলে যাবে। ( সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নম্বর: ৪৭৫৩) কবরের চাপ থেকে কেউই রেহায় পাবে না। ( মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নম্বর: ২৪৬৬৩) তবে মুমীনের জন্য এই চাপ হবে, মা তার সন্তানের সাথে স্নেহমাখা মোয়ানাকার ন্যায়। অতপর কবরকে তাঁর জন্য দৃষ্টিসীমা পযর্ন্ত প্রশস্ত করে দেয়া হবে। ( মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ৩/৪৯-৫০, শরহে ফিকহুল আকবার : পৃ. ১৭২)

(গ) কবরে হিসাব-নিকাশের পূর্বেই শাস্তি দেয়া হচ্ছে, কথাটি সঠিক নয়। কারণ, কবরে তাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে মুনকার-নাকীরের প্রশ্নের উত্তর প্রদানে অক্ষম হওয়ার কারণে। তো এটি একটি পরিক্ষা যাতে উত্তীর্ণ না হতে পারলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। অসংখ্য হাদীসে এটি বর্ণিত হয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নম্বর: ৪৭৫৩, মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ৩/৫৩) এটি কবর জগতের শাস্তি। আর পরকালের যে শাস্তির কথা এসেছে, তা পুনরুত্থানের পর হবে।

পরকাল ও কবরের জীবন , দুটি ভিন্ন জগত। উভয় জগতের শান্তি ও শাস্তি এক নয়। সুনানে  তিরমিযীর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, কবর হলো আখেরাতের ঘাটি সমূহ হতে প্রথম ঘাটি। এই ঘাটির পরিক্ষায় যদি কেউ উত্তীর্ণ হয়ে যায়, তাহলে তার জন্য পরবর্তী ঘাটিগুলো পার হওয়া সহজ হয়ে যাবে। আর যদি উত্তীর্ণ না হতে পারে, তাহলে ( এখানে শাস্তি ভোগ করবে আর) পরবর্তী ঘাটিগুলো পার হওয়া তার চেয়ে ও কঠিন হয়ে যাবে।

( সুনানে তিরমিযী : হাদীস নম্বর: ২৩০৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস নম্বর: ৪২৬৭, মুসনাদে আহমাদ : হাদীস নম্বর: ৪৫৪ )

و الله اعلم با لصواب

দলীল সমূহ

  • সহীহ বুখারী : হাদীস নম্বর: ৬৪৮০, ৬৪৮১, ৩৪৭৮, ৭৫০৮ মুয়াসসিসাতুল মুখতার।
  • সহীহ মুসলিম : হাদীস নম্বর: ২৭৫৭ মুআসসিসাতুল মুখতার।
  • সুনানে তিরমিযী : হাদীস নম্বর: ২৩০৮ দারু ইবনিল জাওযী।
  • সুনানে আবু দাউদ : হাদীস নম্বর: ৪৭৫৩ দারু ইবনিল জাওযী।
  • সুনানে নাসায়ী : হাদীস নম্বর: ২০৭৯, ২০৮০ মাকতাবাতুস-সফা।
  • সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস নম্বর: ৪২৬৭ দারুল মুআদ্দাহ।
  • মুসনাদে আহমাদ : হাদীস নম্বর: ৪৫৪, ২৩৩৫৩ ২৪৬৬৩, ২৪২৮৩ মুআসসিসাতুর-রিসালাহ্।
  • শরহু মুশকিলিল আছার : হাদীস নম্বর: ২৭২ আর-রিসালাতুল আলামিয়া।
  • মুসনাদে বাযযার : হাদীস নম্বর: ৫০৩ দারুল হাদীস, কাহেরা।
  • বায়হাকী, সুনানে কাবীর : হাদীস নম্বর: ৭১৪৫
  • বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান : হাদীস নম্বর: ৩৯৮ দারুল ফিকর।
  • মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ৩/৫৩-৫৭, ৩/৪৯-৫০ মুআসসিসাতুল-মাআরিফ।
  • আল-ফিকহুল আকবার : পৃ. ১৭১-১৭২ দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ।
  • শরহে ফিকহুল আকবার : পৃ. ১৭১-১৭২ দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ।
  • শরহে আকিদাতুত-তহাবীয়্যাহ : ২/৬১০-৬১১ দারু-রিসালাতিল আলামিয়্যাহ।
  • আর-রুহ : পৃ. : ১৮১, ২০১-২০২ দারে ইবনে কাসীর।
  • আত-তাওযীহাতুল জালিয়্যাহ : ৩/১০২৯, ৩/১০৩৫ দারু ইবনিল জাওযী।
  • ফাতহুল বারী : ৬/৫৮৮-৫৮৯ দারুল হাদীস, কাহেরা।
  • উমদাতুল কারী : ১১/২৩২-২৩৩ দারুল ফিকর।
  • মিরকাতুল মাফাতীহ : ১/৩১০ আল-মাকতাবা আল-আশরাফিয়াহ।
  • হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাহ : ১/১৩৩-১৩৮ দারে ইবনে কাসীর।
  • মাআরিফুল হাদীস : ১/১২৬ দারুল ইশাআত।
  • ইনআমুল বারী : ৮/২৬২ আশরাফী বুক ডিপো।
  • ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ : ১৮/৭৮ মাকতাবা দারুল উলূম দেওবন্দ।
  • আশরাফুল জাওয়াব : পৃ. : ৫৫৬ মাকতাবা থানভী. দেওবন্দ।
  • আহকামে ইসলাম আকল কী নযর মে : পৃ. : ৩৫০ মাকতাবা থানভী. দেওবন্দ।
  • ফাতাওয়া মাহমুদিয়াহ : ৩/৩৭২-৩৭৫ মাকতাবা মাহমুদিয়াহ।
  • আপ কে মাসায়েল আওর উন কা হল : ২/৪২০-৪২১ নাঈমিয়া কুতুবখানা।
  • কিতাবুন নাওয়াযেল : ১/৩১৭-৩১৮ যাকারিয়া বুক ডিপো।
  • কিতাবুল ফাতাওয়া : ১/৩৬৪-৩৬৭, ৩/২৩৭-২৩৮ নাঈমিয়া কুতুবখানা।

সোশ্যাল মিডিয়া

Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সংবাদ